Pages

Ads 468x60px

Saturday, October 20, 2012

প্রসঙ্গ-লবণ (তৃতীয় পর্ব)

অরুণ প্রকৃতিবাদী
ভাষ্যকার
প্রকৃতিবাদ ও প্রকৃতিতন্ত্র

(তৃতীয় পর্ব) একজিমাতে এবং অন্য যে কোন চর্মরোগ, চুলকানিতে নোনতা খাবার, পাতে নুনের ব্যবহার মারাত্মক ক্ষতি করেলবণ খাওয়া চলতে  থাকলে কিছুতেই কোন চর্মরোগ সারে নাওষুধ ও মলম ইত্যাদির প্রয়োগে চর্মরোগ চাপা পড়ে, সারে নাপরে আরও বীভস আকারে ঐ রোগ ফিরে আসেলবণ বর্জন করলে এর থেকে মুক্তি সম্ভব

যখন কোন মানুষের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে, যখন সে তার শরীরের ভেতর জমে ওঠা নানা দূষিত আবর্জনা শরীর থেকে বাইরে দূর করে দিতে পারে না তখন সে প্রাণবিনাশী কিছু রোগ যেমন ক্যান্সার, এইড্স্ ইত্যাদিতে আক্রান্ত হয়শরীরের এ ধরণের অসহায় অবস্থায় যদি লবণ পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া না হয় তবে তার আরোগ্যের কোন আশা থাকবে নাক্যান্সার রোগাক্রান্ত ব্যক্তি যদি লবণ খাওয়া পুরোপুরি বর্জন না করে তার রোগ কোনভাবেই সারবে না বা তেমন উপশমও হবে নাঅনেক বিশেষজ্ঞের মতে ক্যান্সার এক ধরণের ছত্রাক জাতীয় বৃদ্ধিযদি একথা সত্যি হয় তবে ক্যান্সার রোগী লবণ খেতে থাকলে তার রোগ আরও ভয়ানকভাবে বেড়ে যাবেযারা ছত্রাক চাষ করে তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে ছত্রাক বাড়ানোর জন্য ছত্রাকের জন্মক্ষেত্রে উষ্ণ লবণগোলা জল বারে বারে ছিটিয়ে দেনতাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে যে এই লবণ-জল তাদের ছত্রাক (Mushroom) ফলন প্রভূত পরিমাণে বৃদ্ধি করেএটাই যদি ঘটনা তাহলে ছত্রাক জাতীয় ক্যান্সার রোগে লবণ ব্যবহার করলে রোগ বাড়তেই থাকবে


অতিরিক্ত লবণ খেলে পাকস্থলীর পাতলা আবরণ নষ্ট হয়ে যায়এভাবে লবণ খেতে থাকলে যে কোন দিন পাকস্থলীর ক্ষত রোগ হতে পারে

লবণ পুরোপুরি ছাড়তে না পারলে বিভিন্ন খাবার যেমন- টক ফল, মূল, বাদাম, পোড়া খাবার, সেদ্ধ খাবার, স্যালাড ইত্যাদিতে অন্তত কাঁচা লবণের ব্যবহার বন্ধ করা উচিত

রান্না করলে লবণ নির্বিষ হয় নাসেজন্য কাঁচা লবণের পরিবর্তে লবণ ভেজে খেলেও অপকারই হবেরান্নাতেও তাই যত লবণ কম খাওয়া যায় ততই ভাল

পশুদের ক্ষেত্রে লবণের বিষয়ে বলা যায় যে, কোন বুনো প্রাণী লবণ খায় না, তাদের দরকারও পড়ে নাকিন্তু গৃহপালিত পশুগুলোকে নোনতা খাদ্য ও লবণ খাইয়ে খাইয়ে তাদের মধ্যে লবণের এক চাহিদা সৃষ্টি করা হয়কিন্তু এ লবণ-অভ্যাস ঐ পোষা প্রাণীগুলোর পক্ষে খুবই  ক্ষতিকর হয়যে সব গবাদি পশু লবণ খেতে অভ্যস্ত হয় তারা ক্ষুর আর মুখের দুরারোগ্য রোগে অকালে মারা পড়েযে সব গো-মহিষ পালক তাদের পশুদের মোটেও লবণ দেয় না, তাদের পশুদের ঐ ধরনের কদর্য প্রাণঘাতী রোগ হয় না

            গোপালকরা গরুমোষগুলোকে লবণ (সাধারণ লবণ বা বীট লবণ) দেন এক বিশেষ উদ্দেশ্যেতাদের লক্ষ্য কী করে পশুগুলোর দুধের যোগান সর্বোচ্চ সীমায় বাড়ানো যায়গৃহপালিত সব পশুকেই লবণ মাখা খাবার দেওয়া হয় যাতে তাদের খুব বেশি পিপাসা পায়বেশি পিপাসার্ত হলে ওরা বেশি জলপান করবেএভাবে বেশি জলপান করতে থাকলে ক্রমে ওদের পাকস্থলীর ধারণক্ষমতা আরও বাড়বেতখন গো-মহিষ আরও বেশি পরিমাণে খেতে পারবে কারণ পাকস্থলী অপেক্ষাকৃত বড় হয়ে যায়এভাবে যত বেশি খাদ্য খাবে তত বেশি দুধ দেবেএরকম বাড়তি দুধ যাতে আরও বেশি করে পাওয়া যায় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই গরুমোষকে আদর করে বেশি লবণ খাওয়ানো হয়ে থাকেকিন্তু এভাবে লবণ খেয়ে ঐ প্রাণীগুলো মারাত্মক রোগের (বিশেষ করে ক্ষুর আর মুখের দুঃসাধ্য রোগ) শিকার হয়ে পড়ে
           
            সাধারণ লবণ প্রায় সব প্রাণীর পক্ষেই প্রাণঘাতীকীট-পতঙ্গ, পাখি, পশু, মানুষ কারো রেহাই নেই লবণের সর্বনাশা প্রতিক্রিয়া থেকেকোন পোকামাকড় কখনও লবণের ধারে কাছে থাকে নাটক, মিষ্টি, কটু, কষায় সব খাবারেই নানা পোকা, পিঁপড়ে ও মাছির উপাত হয় কিন্তু লবণে বা লবণ ভরা খাবারে ওদের কারো আগ্রহ নেইআসলে লবণ ওদের পক্ষে মারাত্মকলবণ ছিটিয়ে দিলে বহু কীট পতঙ্গই শেষ হয়ে যায়পাখিকে বেশি লবণ খেতে দিলে ওগুলো মারা যাবেশিঙ্গি, মাগুর এবং কৈ মাছ কি কম তেজী ? গৃহিনীরা অনেকেই ঐ মাছগুলোকে কাটবার সময় ওগুলোর কাঁটার বিষের ভয়ে আগেই ওগুলোর মাথা ও মুখের ওপর লবণ ছিটিয়ে দেন আর তখনই ঐ তেজী তরতাজা মাছগুলো কেমন আধমরা হয়ে যায়তখন ঐ মাছগুলোকে কাটতে আর ভয় লাগে না

এখানে প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে সমুদ্রের লোনাজলে মাছ বা অন্য সামুদ্রিক প্রাণী বেঁচে থাকে কী করে ? সমুদ্রের প্রাণীদের দৈহিক কলকব্জা এমনই যে ওরা লবণের প্রাণবিনাশী ক্রিয়া থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে

বলা যায় সামুদ্রিক প্রাণীগুলোকে বাদ দিলে প্রায় সব জীবজন্তু ও মানুষের মুখেই লবণ ঠিক জোঁকের মুখে লবণের মতলবণ শুধু জোঁকেরই জীবন নেয় না, সব জীবেরই জীবনীশক্তিকে নষ্ট করে দেয়২১

হোমিওপ্যাথিতে এমন কিছু ওষুধ আছে যেগুলো ব্যবহারকালীন রোগী পুরোপুরি লবণ বর্জন না করলে ওষুধের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায় অথবা একেবারেই কাজ করে নাসেই ওষুধগুলো হলো: এগ্নাস-কাস্ট, এলুমেন, ক্যালকেরিয়া কার্ব, কার্বো-ভেজ, এমন-মিউর, ব্রোমিয়াম, ড্রসেরা, লাইকোপোডিয়াম, ম্যাগ-মিউর, মেডোরিনাম, নেট্রাম-মিউর, নেট্রাম-সালফ্, নাক্স-ভম্, ফসফরাস, ফাইটোলাক্কা, পডোফাইলাম, সেলেনিয়াম, স্পাইজেলিয়া, থুজা-অক্সি এবং বোরিক ধাতুর রোগীর জন্য ব্যবহৃত ওষুধ২২ 

আমাদের দেহের জল ও সমুদ্রের জল একই রকমেরআমাদের পানীয় জলে সমুদ্রের জল বা আমাদের দেহের মতো লবণ থাকে নাআমরা আমাদের প্রয়োজনীয় লবণ পাই সবজি ও অন্যান্য খাদ্য থেকেকখনও কখনও এই লবণ যথেষ্ট পরিমাণে গ্রহণ না করলে, আমাদের দেহে এদের অভাব ঘটেফলে দেহে রোগের সৃষ্টি হয়ওষুধরূপে এই লবণ খেলে রোগ সেরে যায়জার্মান ডাক্তার সুসলার এই বিষয়ে অনেক গবেষণা করেছেনতাঁর গবেষণার ফল বায়োকেমিস্ট্রি বা জৈবরসায়নতিনি বলেছেন, দেহে কোটি কোটি ক্ষুদ্র কোষ আছেতাই এই বারোটি লবণের মধ্যে স্বল্প পরিমাণে এক বা একাধিক খেলে তা এই কোষগুলোতে পৌঁছে যাবে এবং সেগুলো সঠিকভাবে কাজ করবে

অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে যে এই লবণগুলো সপ্তাহের প্রথম দিনে ২০০ মাত্রায় (শক্তিতে) দিতে হয় এবং বাকি ছয় দিনে দিতে হবে ১২ থেকে ৩০ মাত্রায়এই চিকিসা চার থেকে ছয় সপ্তাহ চালাবার দরকার হয়

এটি একটি নিরাপদ চিকিসা, যা রোগী নিজেই করতে পারেনপ্রয়োজন হলে একটির বেশি লবণ মিশিয়ে একসঙ্গে খাওয়া যায়এটি শিশুদের পক্ষেও খুব উপকারি

এই বারোটি লবণ সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা নিচের তালিকায় দেওয়া হলো

নাম     স্থান     যেসব রোগে কার্যকর
১. ক্যালকার ফস (ক্যালসিয়াম ফসফেট)        দাঁত, হাড়, রক্ত ও টিস্যুতে দাঁত, হাড়, রক্ত ও টিস্যুর সমস্যায় কার্যকর, টিস্যু সম্বন্ধিত সব সমস্যাতে, যেমন দুশ্চিন্তা, সর্দি, খিদে কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, প্রস্রাবে জ্বালা যন্ত্রণা ইত্যাদিতে
২. ক্যালকার সালফ (ক্যালসিয়াম সালফেট)    টিস্যুর মাঝে অবস্থিত    দেহ থেকে বিষ বার করে দিতে, সর্দি, কাশি, ক্ষয় রোগ, ফোড়া, ক্ষত কান ফোলা, প্রস্রাবে পুঁজ ও রক্তবাত ইত্যাদিতে কার্যকর
৩. ক্যালকার ফ্লোর (ক্যালসিয়াম ফ্লোরাইড)     স্নায়ু পেশিতে    এটা সঙ্কোচন করেতাই যখনই স্নায়ু বা পেশিগুলো ঢিলে হয়ে পড়ে, এই ওষুধগুলো তাদের টান টান করে
৪. ফেরাম ফস (ফেরাম ফসফেট)        রক্ত কোষে      অ্যানিমিয়া, রক্তে কিছুর অভাবজনিত সবরকম জ্বরে, মনঃসংযোগের অভাবে ও ভুলো অবস্থায়
৫. কালি মুইর (পট্যাশিয়াম ক্লোরাইড) রক্ত-পেশি ও স্নায়ুতে    রক্ত-পেশি, বদ-হজম, বমি, পাতলা পায়খানা এবং কোমল স্নায়ু ফুলে যাওয়ার সমস্যায়, সকল প্রকার শ্বাসকষ্টে
৬. কালি ফস (পট্যাশিয়াম ফসফেট)    মস্তিষ্ক স্নায়ু ও পেশিতে  মস্তিষ্ক ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সকল সমস্যায়বারোটি লবণের রাজা বলে গণ্য করা হয়
৭. কালি সাল্ফ (পট্যাশিয়াম সালফেট)  ত্বক ও ধমনীতে          ঘামের ক্রিয়া ব্যাহত হলে অথবা জীবাণুর কারণে হওয়া ত্বকের সকল সমস্যায়, বাত-জ্বরে, নারীদের জন্য ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে
৮. ম্যাগ ফস (ম্যাগনীজিয়াম ফসফেট) পেশি মজ্জাতে   ধমনীর পেশি ঢিলে হয়ে গেলে, সকল প্রকার ব্যথা, মাথা ধরা, খিঁচুনি, মৃগি, পক্ষাঘাত ইত্যাদিতে
৯. ন্যাট্রাম মুইর (সোডিয়াম ক্লোরাইড) দেহের জলে     সর্দিগর্মি, জলহীনতা, অনিদ্রা, মস্তিষ্কের দুর্বলতা, বুক ধড়পড় ইত্যাদি
১০. ন্যাট্রাম ফস (সোডিয়াম ফসফেট)  দেহের জলে     অম্লতা, ক্রিমি, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, হৃদযন্ত্রের সমস্যায়
১১. ন্যাট্রাম সাল্ফ (পট্যাশিয়াম সালফেট)        দেহের জলে     দেহে জল নিয়ন্ত্রণ করেমূত্র উৎপাদন করে
১২. সিলিসিয়া দেহের জলে এটি পৃথিবীর তত্ত্ব, দেহের শল্য চিকিসক রূপে কাজ করে, ফোড়াতে খুব কার্যকর২৩

এই বারোটি লবণের মধ্যে একটি সোডিয়াম ক্লোরাইড (সাধারণ লবণ) থেকে পাওয়া যায়ডাঃ সুসলার দেখিয়েছেন এই অজৈব লবণ খুব সূক্ষ্মমাত্রায় আমাদের শরীরে স্বাস্থ্যপ্রদ হয়ে থাকেঅজৈব লবণের স্থূলমাত্রায় ব্যবহারকে তিনি কোথাও অনুমোদন করেন নিআমরা যখন আমাদের খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার করি তখন আমাদের দুটো অপরাধ হয়প্রথম অপরাধ- আমরা বারটি অজৈব লবণের মধ্যে কেবলমাত্র একটিকে বেশি পরিমাণে গ্রহণ করে আমাদের শরীরে অজৈব লবণগুলোর স্বাস্থ্যসম্মত স্বাভাবিক সমানুপাতকে নষ্ট করে দিচ্ছিদ্বিতীয় অপরাধ- আমরা অজৈব লবণকে স্থূলমাত্রায় ব্যবহার করছিতাই বায়োকেমিক চিকিসা তত্ত্বের দিক থেকেও বলা যায়  যে  সাধারণ  লবণের  খাদ্যপথ্যে  ব্যবহার  বিশেষভাবেই ক্ষতিকর

আমরা কতদিকে কতভাবে কত পরিমাণে লবণ খাচ্ছি সে বিষয়ে আমরা কি সব সময় সজাগ থাকি ? সমস্ত টিনে ভরা মাংস ও মাছে অনেকটা পরিমাণ লবণ মেশানো  থাকেমিষ্টি মধুর সব আইসক্রীমে কম লবণ নেইটুথপেস্টেও বেশ লবণ আছেএমনকি অ্যাসপিরিন জাতীয় ট্যাবলেটে লবণ আছেসুস্বাদু করতে প্রত্যেক খাবারে প্রত্যেক পানীয়ে লবণ মেশানো হচ্ছেস্যালাডের (শাক-সব্জীর কাঁচা ব্যঞ্জন) স্বাদ বাড়াতে অনেকেই তাতে লবণ মাখেখাবার টেবিলে লবণ তো থাকেইভাত পাতেও লবণ অনেকেই নেয়নেমন্তন্ন বাড়ীতে পাতে প্রথমেই লবণ দেওয়া তো রীতিলবণ লাগিয়ে শসা খাওয়ার দৃশ্য তো চারপাশেশুধু শসাতে নয়, পেয়ারা ও শাকালুতেও লবণ মেখে খেতে দেখা যায়বাদামওয়ালারা হাঁক দেয়, বীট নুন আছে, বাদাম ভাজা নিনসব জাতের লবণই (যেমন বীট, করকচ, সৈন্ধব আর সাধারণ লবণ) আমাদের পক্ষে ক্ষতিকরআগেই বলা হয়েছে, কোন অজৈব লবণই আমাদের শরীরে সরাসরি গৃহীত হয় নাপ্রকৃতির কোন অজৈব বস্তুকে আমাদের শরীরে আত্তীকরণ করতে গেলে গাছ গাছড়ার মাধ্যমেই তা করতে হবেআমাদের শরীরে যে সব লবণের চাহিদা রয়েছে সে সবগুলোই পাওয়া যাবে যদি আমরা বীট, গাজর, মূলো, পেঁয়াজ, রসুন, বাঁধাকপি, পালং, লেটুস, মূলোশাক, বেতোশাক, মেথিশাক, পুঁদিনা, থানকুনী, গোল আলু, শাকালু, রাঙালু এবং নানান ধরণের মরশুমী ফল, বাদাম কাঁচা খাইআসলে বৃক্ষের ছাল, মূল, পাতা, ফুল ও ফল ইত্যাদি থেকেই কাঁচা অবস্থায় আমাদের শরীরোপযোগী সব লবণ পাওয়া যাবেডাঃ সুসলার অজৈব লবণকে সূক্ষ্মমাত্রায় উপকারী বলেছেনকথাটাকে আমরা অস্বীকার করছি নাতবে ডাঃ সুসলারের মত আমরা কখনই কোন কেমিক্যাল ল্যাবোরেটরিতে এ   অজৈব  লবণ  তৈরি করতে বলব না।  প্রাকৃতিক নিয়মের দিক থেকে আমাদের কথা হল যে, বৃক্ষলতা ফলমূল ইত্যাদি তাদের শরীরে এক বিশেষ শ্রেণীর অজৈব লবণ তৈরি করেসেই লবণই মানুষের শরীরে গৃহীত হবার যোগ্য এবং সেই লবণ মানুষের শরীরে গেলে তার পক্ষে ভাল হয়তখন ঐ লবণই ওষুধ হয়ে যায়বনের পশুগুলো এভাবেই গাছপালা ঘাসপাতা খেয়ে পেয়ে যায় তাদের উপযোগী প্রয়োজনীয় অজৈব লবণআমরাও শহরে নগরে সভ্যতার পালঙ্কে বাস করেও পর্যাপ্ত পরিমাণে কাঁচা শাকসব্জী ফলমূল খেয়ে বনের পশুদের মত পরিমাণমত অজৈব লবণ পেতে পারি এবং ঐ বন্য প্রাণীদের মতই সুন্দর স্বাভাবিক স্বাস্থ্য লাভ করতে পারি

ভারতের প্রাচীনতম চিকিসাবিজ্ঞান আয়ুর্বেদ লবণের ব্যবহার সম্পর্কে হুঁশিয়ারী দিয়েছেচরক সংহিতাতে পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে লবণের বহু দোষের কথাসেখানে বলা হয়েছে, লবণ অতিরিক্ত খেলে পিত্ত বৃদ্ধি পায়, পিপাসা হয়, মূর্চ্ছা হয়, দেহের তাপ বাড়ে, গায়ে জ্বালা পোড়া ভাব হয়, চুলকণা দেখা দেয়, কুষ্ঠের সম্ভাবনা হয়, দেহ বিষিয়ে যায়, দাঁত কালচে হয়, শক্তি সামর্থ্য কমে যায়, পুরুষত্বের হানি হয়, ইন্দ্রিয় ক্ষমতা কমে যায়, অকালে চামড়া কুঁচকে যায়, চুল পেকে যায় ও টাক জন্মায়২৪

‘‘প্রকৃতপক্ষে লবণ ও অন্যান্য মসলা না হলে যে আমাদের চলে না তা নয়উত্তর মেরুর এস্কুইমোরা কখনও লবণ ও অন্যান্য মসলা খায় নাএমন কি তারা না খেয়ে থাকতে প্রস্তুত, তথাপি লবণযুক্ত খাদ্য খাবে না (Aoxel Emil Gibson- Sugar and Salt, Foods of Poison, p.82) ২৫

হলিউডের ফিল্ম স্টারদের কনসালটেন্ট ড. ডোনাল্ড লুমিস বলতেন, ‘খাদ্যে যথেষ্ট প্রাকৃতিক লবণ আছে এবং যখন কোন অভিনেত্রী স্টুডিওর প্রখর আলোর নীচে কাজ করেন তখন আরও বেশি লবণ সংশ্লেষণ করেনতাদের চেহারার জন্য এটা বিপজ্জনক হতে পারেতিনি তাদের খাবারে লবণ যতদূর সম্ভব পরিহার করতে এবং সপ্তাহে একদিন লবণবিহীন খাদ্য গ্রহণের পরামর্শ দিতেনএতে অনেকেই লবণ ছেড়ে দিতযদিও স্বল্পসংখ্যক লোকই লবণবিহীন খাবার খেতে অভ্যস্ত হত

সোডিয়াম এবং ক্লোরিন এই দুটি মারাত্মক বিষাক্ত পদার্থের সংযোগে সাধারণ লবণ গঠিতখাঁটি সোডিয়াম গিলে ফেললে পাকস্থলীর গরম জুসের সংশ্রবে এসে বিস্ফোরণ ঘটবেক্লোরিন  একটা  ভারী  হলুদাভ  সবুজ  দম-বন্ধকারী বিষাক্ত গ্যাসকিন্তু যখন দুয়ের সমন্বয়ে সোডিয়াম ক্লোরাইড গঠিত হয় তখন তা তুলনামূলকভাবে ক্ষতিকর কম হয়সাধারণ লবণ, যা কোষে পানি জমায় এবং আয়তনে বেশি হয়, মহিলারা যারা ওজন কমাতে চান তাদের বিষয়টি মনে রেখে লবণ কম খাওয়া উচিত

            তথাকথিত সভ্য জগতের লাখ লাখ মানুষ কষ্ট পাচ্ছে মাথার যন্ত্রণায়নানাবিধ কারণের একটা হচ্ছে এই যে, যারা ভুগছেন তাদের বেশিরভাগই লবণ বেশি খানযদি আপনি তাদের একজন হন তবে লবণ ছেড়ে দিন, তার পর দেখুন কী হয়

            হাসপাতালের রোগীদের নিয়ে শত শত পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তিনি সিদ্ধান্ত টেনেছেন যে, যদি সন্ধ্যার পর খাবারের সাথে অনেক লবণ দেওয়া হয় তবে তারা প্রায়ই জাগ্রত থাকে অথবা এমনকি স্বপ্নচারিতা করেঘটনাচক্রে তারা যদিও ঘুমায় তথাপি সেই সুখনিদ্রা পরবর্তীতে রোগের আক্রমণে স্থায়ী হয় না

            যখন একই রোগীকে সম্পূর্ণ লবণমুক্ত খাবার দেওয়া হয় তখন তাদের ঘুম হয় গভীর এবং শান্তিপূর্ণ২৬
লবণ মস্তিষ্কের স্ট্রোকের সম্ভাবনা বাড়ায়আবার এমন সমস্যা সৃষ্টি করে যাকে ভাসকুলার ডিমেনশিয়া বলেঅর্থা হাত জানে না বা ভুলে গেছে তাকে কী করতে হবে আর পা জানে না তাকে কী করতে হবে২৭

যারা উচ্চরক্তচাপ বা হৃদযন্ত্রের নানা সমস্যায় ভুগছেন তাদের পক্ষে বেশি লবণের মুড়ি একটানা খাওয়া অবশ্যই বিপজ্জনকএরা বাজারের হরেক রকমের মুড়ি থেকে কম লবণে ভাজা মুড়িটা খুঁজে নেবেনএকই কথা কিডনির সমস্যায় ভোগা বাচ্চা আর বয়স্ক মানুষের মুড়ি খাবার বেলাতেওশুধু কম লবণের মুড়ি কিনলে চলবে না, এরকম মুড়ি মাখার সময় স্বাদ বাড়াতে আর পাঁচটা উপকরণের সঙ্গে লবণ বা আচার মেশানো যাবে না একই কারণেলবণ মানেই সোডিয়াম ক্লোরাইডসাধারণ সাদা লবণ, ভাজা লবণ, বিট লবণ বা সৈন্ধব লবণ- নাম যাই হোক না কেন; চলবে না কোনটাই২৮

            “দুঃখের ও দুশ্চিন্তার বিষয় হল এই যে, আমাদের শিক্ষিত সমাজ আজও লবণের কুফল সম্পর্কে তেমন সচেতন হচ্ছেন নালবণের পাত্রে যেদিন থেকে বিষএই ছাপ দেওয়া হবে সেদিন থেকে আমরা লবণকে চিনেছি বলে বলা যাবে২৯


প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব

No comments:

Post a Comment

 

Sample text

Sample Text

Sample Text